দল থেকে বহিষ্কার ও এমপি পদ: সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের আলোকে বিশ্লেষণ
Bangladailypost.com – দল থ ক বহ ষ ক র – বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন উঠে এসেছে। যদি তিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হন, তবে কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর সংসদ সদস্য পদও বাতিল হয়ে যাবে? আইনজ্ঞদের মতে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদটি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কী বলে?
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য যদি নিজ দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেন, তবে তাঁর সদস্যপদ শূন্য হতে পারে। তবে কোনো রাজনৈতিক দল কাউকে বহিষ্কার করলে তা এই অনুচ্ছেদের আওতায় পড়ে না। আইন অনুযায়ী, দল থেকে বহিষ্কারের পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল থাকতে পারেন। কারণ, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে দল থেকে বহিষ্কারকে সংসদ সদস্য পদ বাতিলের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
কোনো রাজনৈতিক দল কাউকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দল থেকে বহিষ্কার করে সংসদের স্পিকারের কাছে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিলের আবেদন করলে এমপি পদ বাতিল হওয়ার নজির রয়েছে। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য লতিফ সিদ্দিকীর ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছিল। অন্যদিকে, কোনো দল শুধু সাংগঠনিক পদ বাতিল করে এবং স্পিকারের কাছে সংসদ সদস্য পদ বাতিলের আবেদন না করলে এমপি পদ বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
গোলাম রেজার ক্ষেত্রে কী হলো?
নবম জাতীয় সংসদের জাতীয় পার্টির সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি এইচ এম গোলাম রেজাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও স্পিকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে না জানানোর কারণে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বহাল ছিল। ফলে শুধু দল থেকে বহিষ্কার করলেই কোনো সংসদ সদস্যের পদ বাতিল হয় না। কোনো রাজনৈতিক দল প্রাথমিক সদস্য পদসহ কাউকে বহিষ্কার করে এবং তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিলের জন্য স্পিকারের কাছে আবেদন জানালে বিষয়টি সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়ায় বিবেচিত হতে পারে। তবে প্রতিটি ঘটনার সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি ও আইনি ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে।
জামায়াতের অবস্থান ও ইসির প্রতিক্রিয়া
গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ নজরে রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। মঙ্গলবার দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের এক বিবৃতিতে বলেন, গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ ও আলোচনার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে দল।
গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছি। আমরা ইসিকে জানিয়ে দিয়েছি। ইসি স্পিকারকে জানাবে। আমরা কাউকে দল থেকে বহিষ্কার করতে পারি, কিন্তু এমপি থেকে বহিষ্কার করতে পারি না।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম এই মন্তব্য করেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, আমরা জামায়াত থেকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি পাইনি। তাই এ বিষয়ে কোনো কথা বলা যাবে না।
সম্ভাব্য পরিস্থিতি
আইনজ্ঞদের মতে, গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে কয়েকটি সম্ভাবনা রয়েছে—
- দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল থাকতে পারেন।
- বিষয়টি স্পিকারের ব্যাখ্যা বা আদালতের আইনি সিদ্ধান্তের পর্যায়ে যেতে পারে।
- রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে নতুন কোনো সমঝোতা বা সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, শুধু দল থেকে বহিষ্কার হওয়ায় কোনো সংসদ সদস্যের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না। তবে স্পিকারের সিদ্ধান্ত, আদালতের ব্যাখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে কি না। এ কারণে বিষয়টি শুধু একজন এমপির ভবিষ্যৎ নিয়েই নয় বরং বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে দলীয় শৃঙ্খলা ও সংবিধানের প্রয়োগ সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
