টিকটক থেকে আদালত: ১৩ বছরের কিশোরীর ৭ মাসের শিশুকে কেন্দ্র করে আইনি যুদ্ধ
Bangladailypost.com – ১৩ বছর র ক শ র র – সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবি আজকের দিনে দেশজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী কোলে সাত মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে বসে আছেন। ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ের শুনানির সময় ওই দৃশ্যটি ধারণ করা হয়েছিল। পরে তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
টিকটকের মাধ্যমে পরিচয়, নোটারির মাধ্যমে বিবাহ
কিশোরীর পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, সে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় টিকটকের মাধ্যমে শাকিল মিঞা নামের এক যুবকের সাথে পরিচয় হয়। শাকিলের বয়স তখন ২২ বছর। কিশোরী নিজেই জানিয়েছে, তখন তার বয়স মাত্র ১১ বছর। দুই মাসের পরিচয়ের পর শাকিল তাকে বিভিন্ন কথা বলে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। সে বলেছিল, দুই পরিবারের কেউ তাদের সম্পর্ক মেনে নেবে না, তাই তাকে সাথে যেতে হবে।
কেরানীগঞ্জে গিয়ে কাজির মাধ্যমে ঘরোয়াভাবে বিবাহ সম্পন্ন হয়। পরে আদালতে গিয়ে কিশোরী জানতে পারে, নোটারির মাধ্যমে করা ওই কাগজের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। তখনই সে বুঝতে পারে, তার সাথে প্রতারণা করা হয়েছে।
নির্যাতন ও শিশুকে নিয়ে বিতর্ক
কিশোরীর অভিযোগ, শাকিলের বাসায় যাওয়ার পর থেকে কোনো ভরণপোষণ দেওয়া হয়নি। একটি ছোট ঘরে কয়েকটি পরিবার একসঙ্গে থাকত। সেখানে তার ওপর নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। এমনকি একাধিকবার তাকে হত্যাচেষ্টাও করা হয়েছে। বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল।
শিশু জন্মের কয়েক মাস পর শিশুকে রেখে কিশোরীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। নিজের সন্তানকে ফিরে পেতে চলতি বছরের ২০ মে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে আবেদন করে ওই কিশোরী। আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ১৬ জুলাই উভয় পক্ষকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদালতের সিদ্ধান্ত ও বর্তমান পরিস্থিতি
অভিযুক্ত পক্ষ উপস্থিত না হওয়ায় চকবাজার থানাকে শিশুটিকে উদ্ধারের নির্দেশ দেন আদালত। পরে পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে। গত ২৮ জুলাই ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে মানবিক দিক বিবেচনায় লিগ্যাল এইড অফিসার মো. সায়েম খান শিশুটিকে আপাতত তার কিশোরী মায়ের জিম্মায় রাখার নির্দেশ দেন।
শুনানির সময় কোলে সন্তান নিয়ে বসে থাকা ১৩ বছর বয়সী ওই কিশোরী মায়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনা সৃষ্টি করে। বর্তমানে সাত মাস বয়সী শিশুটি লিগ্যাল এইডের নির্দেশে তার ১৩ বছর বয়সী মায়ের কাছে রয়েছে। তবে শিশুর স্থায়ী অভিভাবকত্ব, কথিত বিবাহের বৈধতা এবং কিশোরীর পরিবারের আনা অভিযোগ—এসব বিষয়ে পৃথক আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
আমি চাই আমার সন্তান আমার কাছেই থাকুক। আর আমার সঙ্গে যা করা হয়েছে, তার সুষ্ঠু বিচার হোক। যারা আমার সাথে প্রতারণা করেছে এবং নির্যাতন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
পরিবারের বক্তব্য
কিশোরীর বাবা জুয়েল খান জাগো নিউজকে বলেন, মেয়ে তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত। শাকিলের সাথে ফোনে পরিচয়ের বিষয়টি জানার পর তিনি তাদের বলেছিলেন মেয়ে নাবালিকা। কোনোভাবেই বিবাহ দেবেন না। সে অন্তত এসএসসি পরীক্ষা শেষ করুক, এরপর বসে কথা বলা যাবে। তারা তখন বিষয়টি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিলেও কিছুদিন পর মেয়েকে ফুসলিয়ে নিয়ে যায়।
ওই ছেলে প্রথমবার মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার পর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছি। পরে মেয়েকে ফিরিয়ে আনলেও আবারও তাকে নিয়ে যায়।
কিশোরী আরও জানিয়েছে, শাকিল ও তার পরিবারের লোকজন তাকে ও তার মা-বাবাকে বিভিন্ন সময় প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে। তার বাবা গাড়ি চালাতেন। তাকেও রাস্তায় পেলে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হতো।
শিশুটির স্থায়ী অভিভাবকত্ব কার কাছে থাকবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। ওই শুনানিতে শিশুর অভিভাবকত্বসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
