জ্বালানির গভীর সংকটে বাংলাদেশ: ম্যাজিক ল্যাম্প নয়, কাঠামোগত পুনর্গঠন দরকার
Bangladailypost.com – জ ব ল ন স কট ম – কল-কারখানা বন্ধ, শ্রমিক বেকার, রপ্তানি ব্যাহত, উৎপাদন খরচ আকাশছোঁয়া—এই চিত্র এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির দৈনন্দিন বাস্তবতা। পাইপলাইনে গ্যাস না পেয়ে সাধারণ পরিবার দিনরাত বিকল্প হিসেবে দামি এলএনজি বা ইলেকট্রিক চুলার ওপর নির্ভর করছে। মাসে মাসে গ্যাসের বিল পরিশোধের পাশাপাশি অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে। অথচ এই খরচবৃদ্ধির বিপরীতে মানুষের আয় বেড়েছে কি? সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সাম্প্রতিক ঘোষণায় শতভাগ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বেসরকারি কর্মী ও ছোট ব্যবসায়ীদের কী হবে? সবাই একই বাজারে গিয়েই সদাই কেনেন—এই সাধারণ সত্যটি সরকারের নীতিনির্ধারকদের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আর ‘চেরাগ’ের প্রতীক
জ্বালানি সংকটের রাজনৈতিক ময়দানে শনিবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ শুরু করে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনসহ ছয় দফা দাবি ছিল এই কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দু। এর আগের দিন রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে বর্জ্য বিনিময় বাজার কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদু সালাম এই লংমার্চের সমালোচনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আলাদিনের চেরাগ নেই যে ঘষা দিলেই গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি—সব চলে আসবে।
তিনি আরও বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাবিতে লংমার্চের কোনো কার্যকর ফল নেই; বরং এই ধরনের কর্মসূচিতে পেট্রল বা গ্যাসের অপচয়ই হচ্ছে। প্রশ্ন উঠে—আলাদিনের চেরাগের প্রতীক কেন এত প্রচলিত? প্রচলিত ব্যবস্থাটি কেন ধ্বংস হয়ে গেছে যে এখন কোনো অলৌকিক হস্ত না হলে সমাধান সম্ভব নয় মনে করা হচ্ছে?
সংসদের তরুণীয়া: জুলাইয়ের পর ভঙ্গুর অর্থনীতি
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন শুরু হয় গত ৭ জুন। মাত্র তিন দিন পরে, ১০ জুন—বাজেট পেশের আগের দিন—জাতীয় সংসদের বৈঠকে চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। তার আগের দিনও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে এমপিদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
জাতীয় সংসদের স্পিকারও নিজ জেলা ভোলার গ্যাস উপস্থিতি সত্ত্বেও সেখানকার মানুষ প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পাচ্ছে না বলে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১০ জুনের জরুরি জন-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নোটিশ আলোচনায় নাটোরের এমপি রুহুল কুদ্দুস তালুকদার তাঁর এলাকার শিল্পকারখানা ও আবাসিক খাতে গ্যাস সংযোগের দাবি তোলেন। জ্বালানিমন্ত্রী রসিকতার সুরে উত্তর দেন:
আমরা যারা রাজনীতি করি, আমাদের সবার শ্বশুরবাড়ি আছে। সিলেটে গেলে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে বলে সিলেটের দামান, আর নাটোরে গেলে আমাকে বলে নাটোরের জামাই। নাটোর বাংলা ভাষার গালির জন্মস্থান, আমার শ্বশুরবাড়ি। এখানে তো গ্যাস দিতেই হবে।
কিন্তু দেশের জ্বালানি সংকট আর রসিকতার পর্যায়ে নেই। এটি এখন এক নম্বর সমস্যা—এবং এর জন্য দায়ী কারা, তা স্পষ্টভাবে বলা দরকার।
কাঠামোগত ব্যর্থতা: আমদানি-নির্ভরতা আর বাপেক্সের পঙ্গুতা
বাংলাদেশের বিদ্যমান জ্বালানি সংকট মূলত বহুমুখী সমস্যার সম্মিলিত বিস্ফোরণ—অতীতের একাধিক সরকারের গণবিরোধী নীতির ফসল। এখান থেকে রাতারাতি মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। বর্তমানে ৬০ ভাগের বেশি জ্বালানি আমদানি-নির্ভর। যদি এই হার দশ বছর পরে ৯০ শতাংশে পৌঁছায়, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, দেশের জ্বালানি সরবরাহের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাতটি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে—মূলত কিছু কোম্পানির স্বার্থে, যারা বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করেছে। পক্ষান্তরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে পঙ্গু করে রাখা হয়েছে। অতীতের সরকারগুলো যদি বাপেক্সকে শক্তিশালী করত, নিজের দেশের মাটি ও গভীর সমুদ্রের তলদেশ থেকে পর্যাপ্ত গ্যাস উত্তোলন করতে পারত, তাহলে আজকের এই সংকটের বোঝা বহন করতে হতো না।
কয়লা: সম্ভাবনা আর ঝুঁকির সমীকরণ
জ্বালানি সংকট নিরসনের আরেকটি বড় উপায় কয়লা। দিনাজপুরে যে কয়লা আছে, সেটি উন্নত মানের। কিন্তু সেখানের সমস্যা ভিন্ন ধরনের—ভূগর্ভস্থ খনন পদ্ধতিতে যে পরিমাণ কয়লা উত্তোলন করা যায়, অথবা কয়লাকে গ্যাসে রূপান্তর করে যে পরিমাণ জ্বালানি পাওয়া যায়, সেটি চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম। বিকল্প হিসেবে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনন ভাবা হয়।
কিন্তু বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে উন্মুক্ত খননের বিপদ ও ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। ২০০৬ সালে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর মানুষ উন্মুক্ত খননের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিল এবং প্রাণও দিয়েছে। উন্মুক্ত খননের সিদ্ধান্ত সরাসরি মানুষের জীবন, পরিবেশ ও প্রাণ-প্রকৃতির সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত। পৃথিবীর অনেক দেশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হলেও সেসব দেশের বাস্তবতা বাংলাদেশের সঙ্গে মেলে কি না—এটি ভাবা অপরিহার্য।
আবার সব কয়লা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে তোলা যায় না। কয়লার স্তর কত গভীরে, ভূতাত্ত্বিক গঠন কেমন, কয়লার মান কেমন এবং খনন ব্যয় কত—এসবের ওপর নির্ভর করে কোথাও উন্মুক্ত, কোথাও ভূগর্ভস্থ পদ্ধতি প্রযোজ্য হবে। এই বহুস্তরীয় সমস্যার সমাধান কোনো একক সিদ্ধান্তে সম্ভব নয়।
পথসংকেত: ভরসা নিজের ভূখণ্ডে
দিন শেষে নিজের ভূখণ্ড আর সমুদ্রের তলদেশই একমাত্র ভরসার উৎস। বাংলাদেশের মাটির নিচে প্রচুর গ্যাস আছে—এটি প্রমাণিত। গভীর সমুদ্রের তলদেশেও গ্যাস থাকার সম্ভাবনা প্রবল। আমদানি-নির্ভরতা কমাতে নিজস্ব উৎস থেকে গ্যাস আহরণ বাড়ানোই একমাত্র টেকসই পথ। আলাদিনের চেরাগের অপেক্ষায় বসে থাকার বদলে কাঠামোগত পুনর্গঠন—বাপেক্সের ক্ষমতায়ন, গভীর সমুদ্র অনুসন্ধান, কয়লার বুদ্ধিমান ব্যবহার—এই তিন স্তম্ভেই সমাধানের ভিত্তি।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is জ ব ল ন স কট ম?
জ ব ল ন স কট ম is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does জ ব ল ন স কট ম matter?
জ ব ল ন স কট ম matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.

