Opinion

মানুষের পাশে মানুষ নেই কেন?

og_1786595045_6a7d46e5bc478

সময়ের প্রয়োজনে মানুষের পাশে মানুষ নেই কেন?

Bangladailypost.com – ম ন ষ র প শ ম – মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সবসময় টাকা নয়। কখনো একটি ফোনকল, কখনো একটি দরজার কড়া নাড়া, কখনো পাশে বসে থাকা একজন মানুষ—এই সামান্য জিনিসগুলোই একজন বিপর্যস্ত মানুষের পৃথিবীকে আবার কিছুটা বাসযোগ্য করে তুলতে পারে। কিন্তু আমাদের চারপাশে আজ এমন এক অদ্ভুত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে মানুষে মানুষে যোগাযোগ বেড়েছে, অথচ মানুষের পাশে মানুষ কমে গেছে। ফেসবুকে হাজার বন্ধু, ফোনে শত শত নম্বর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য অনুসারী—তবু গভীর রাতে বিপদে পড়লে ফোন করার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না।

ঐতিহ্য থেকে আধুনিকতায়

বাংলাদেশের সমাজ ঐতিহাসিকভাবে পারস্পরিক সহায়তার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে। গ্রামে কারও বাড়িতে বিয়ে হলে প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসতেন, কারও ঘর পুড়ে গেলে সবাই মিলে ঘর তুলতেন, কেউ অসুস্থ হলে পালা করে খোঁজ নিতেন। বিপদে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, পাড়া ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান ছিল মানুষের স্বাভাবিক আশ্রয়। ‘মানুষ মানুষের জন্য’—এটি শুধু কবিতার পঙ্ক্তি ছিল না; একসময় এটি ছিল সামাজিক বাস্তবতা।

কিন্তু সেই সামাজিক কাঠামো ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। নগরায়ণ মানুষকে কাছাকাছি এনেছে, কিন্তু সম্পর্ককে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। ঢাকার একটি বহুতল ভবনে শত শত মানুষ বসবাস করেন। একই লিফটে ওঠেন, একই পার্কিং ব্যবহার করেন, একই বিদ্যুৎ ও পানির সমস্যার ভোগেন। কিন্তু একে অন্যের জীবনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক প্রায় নেই। কেউ অসুস্থ হয়ে ঘরে পড়ে থাকলেও পাশের ফ্ল্যাটের মানুষটি হয়তো জানেন না। কারও মৃত্যু হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকবার্তা আসে, কিন্তু জীবিত অবস্থায় তার দরজায় কেউ কড়া নাড়েনি।

সামাজিক সংযোগের সংকট

এটি কেবল শহরের সমস্যা নয়। গ্রামেও সামাজিক পরিবর্তন দ্রুত ঘটছে। বিদেশে বা শহরে কর্মসংস্থানের জন্য মানুষ ছড়িয়ে পড়ছে, যৌথ পরিবার ভেঙে ছোট পরিবার তৈরি হচ্ছে, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান বদলাচ্ছে। ফলে আগের মতো প্রতিদিনের সহায়তার নেটওয়ার্ক অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে আমাদের সময়ের ব্যবহারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের যোগাযোগের সুযোগ বাড়িয়েছে, কিন্তু সব যোগাযোগ সম্পর্ক তৈরি করে না। ‘লাইক’ সহানুভূতি নয়, ‘কমেন্ট’ সবসময় সংযোগ নয়, আর অনলাইন উপস্থিতি কখনো কখনো বাস্তব অনুপস্থিতিকে আচ্ছাদন করে। আমরা কারও ছবি দেখে বুঝতে পারি সে কোথায় ঘুরছে, কী খাচ্ছে, কী পরছে; কিন্তু সে রাতে ঘুমাতে পারছে কি না, তা জানি না। এখানেই আধুনিক জীবনের এক গভীর বৈপরীত্য। আমরা সবসময় সংযুক্ত, কিন্তু সবসময় একসঙ্গে নই।

২০২৫ সালের World Happiness Report-এ সামাজিক সংযোগ, যত্ন ও পারস্পরিক সহায়তার গুরুত্বকে সুখ ও সুস্থতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে ১৯ শতাংশ তরুণ জানিয়েছে, সামাজিক সহায়তার জন্য তারা নির্ভর করতে পারে—এমন কাউকে তাদের নেই; ২০০৬ সালের তুলনায় এই হার ৩৯ শতাংশ বেড়েছে।

তরুণদের একাকিত্ব

বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই সংকট ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক জীবনে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও গভীর সম্পর্কের অভাব অনেককে একাকিত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। World Happiness Report 2025 বলছে, সামাজিক সম্পর্ক তরুণদের মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো চাপের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে সহায়তা করে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে তরুণদের মধ্যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বেড়েছে।

বাংলাদেশেও বিভিন্ন গবেষণায় মানুষের একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক চাপের অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় পরিচালিত একটি জাতীয় পর্যায়ে তথ্যভিত্তিক গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের উল্লেখযোগ্য অংশ সঙ্গীর অভাব, বিচ্ছিন্নতা এবং প্রয়োজনে কাউকে পাশে না পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিল।

সমস্যার মূল কারণ

অবশ্য মানুষের পাশে মানুষ না থাকার কারণ শুধু প্রযুক্তি নয়। এর পেছনে আছে অর্থনৈতিক চাপ, কর্মজীবনের দীর্ঘ সময়, নগরজীবনের প্রতিযোগিতা, সামাজিক অবিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার উদ্বেগ। একজন মানুষ সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরেন; সন্তানদের সময় দিতে পারেন না। একজন তরুণ চাকরির অনিশ্চয়তায় উদ্বিগ্ন; বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার সময় নেই। একজন বৃদ্ধ বাবা-মা সন্তানের সঙ্গে একই শহরে থেকেও একা। একজন গৃহিণী সারাদিন পরিবারের জন্য কাজ করেন, কিন্তু তাঁর নিজের অনুভূতি শোনার মতো কেউ পাশে থাকেন না।

মানুষের পাশে মানুষ না থাকার এই সংকট কেবল নৈতিকতার সংকট নয়; এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক স্বাস্থ্যেরও বড় সংকট। একদিন হয়তো আমরা বুঝব, একটি সমাজের প্রকৃত শক্তি তার বড় ভবন, দ্রুতগতির ইন্টারনেট বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে যতটা নয়, তার চেয়েও বেশি প্রকাশ পাওয়া বিপদের মুহূর্তে মানুষ কত দ্রুত মানুষের পাশে দাঁড়ায়—সেখানে। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ একা বাঁচে না। মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে আরেকজন মানুষের কণ্ঠ, একটি উষ্ণ হাত, একটি খোলা দরজা এবং সেই আশ্বাস—’তুমি একা নও।’ অর্থাৎ মানুষ শুধু খাবার, বাসস্থান ও আশ্রয় দিয়ে বাঁচে না। মানুষ বাঁচে সম্পর্কের ভেতরেও।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

প্রশ্ন: মানুষের পাশে মানুষ না থাকার প্রধান কারণ কী? উত্তর: নগরায়ণ, প্রযুক্তির প্রভাব, অর্থনৈতিক চাপ, দীর্ঘ কর্মজীবন এবং সামাজিক অবিশ্বাস এই বিষয়গুলোর সমন্বয়ই মূল কারণ।

প্রশ্ন: তরুণদের মধ্যে একাকিত্ব কেন বেড়েছে? উত্তর: বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগ থাকলেও গভীর সম্পর্কের অভাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পৃষ্ঠতলীয় সংযোগ এবং মানসিক চাপের কারণে তরুণদের একাকিত্ব বেড়েছে।

প্রশ্ন: এই সমস্যার সমাধান কীভাবে সম্ভব? উত্তর: প্রতিবেশী ও পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে এই সংকট কমানো সম্ভব।

প্রশ্ন: World Happiness Report 2025-এ কী বলা হয়েছে? উত্তর: প্রতিবেদনে সামাজিক সংযোগ, যত্ন ও পারস্পরিক সহায়তাকে সুখ ও সুস্থতার ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৩ সালে ১৯ শতাংশ তরুণ সামাজিক সহায়তার জন্য নির্ভর করতে পারে—এমন কাউকে তাদের নেই বলে জানিয়েছে।

Frequently Asked Questions

What is ম ন ষ র প শ ম?

ম ন ষ র প শ ম is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.

Why does ম ন ষ র প শ ম matter?

ম ন ষ র প শ ম matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *